
চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটিয়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের কাছে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
চিঠিতে তিনি পুতিনকে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠকে বসার আহ্বান জানিয়েছেন এবং দাবি করেছেন, যুদ্ধ নিয়ে রাশিয়ার সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ী মহল ক্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে।
আজ শুক্রবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে চিঠিটির বিস্তারিত প্রকাশ করে।
ইউক্রেনের রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এই চিঠি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের কাছেও পাঠানো হয়েছে।
এতে জেলেনস্কি পুতিনের দীর্ঘ ২৬ বছরের শাসনামলের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, একসময় ইউক্রেনের অনেক মানুষ তাকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও সেই সময় এখন অতীত।
চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ইউক্রেনের দূরপাল্লার ড্রোন হামলা যখন রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহর সেন্ট পিটার্সবার্গ পর্যন্ত পৌঁছায়, তখন অনেক ইউক্রেনীয় তা স্বাগত জানিয়েছে।
তার দাবি, ইউক্রেনের বিরুদ্ধে চালানো যুদ্ধ কোনও ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োজন নয়, বরং এটি পুতিনের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল। যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়ার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথাও তুলে ধরেন জেলেনস্কি।
তিনি বলেন, গত মে মাসে ইউক্রেন ফ্রন্টে ৩০ হাজারের বেশি রুশ সেনা নিহত বা গুরুতর আহত হয়েছেন। এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কোনও আধুনিক সেনাবাহিনীর জন্য দীর্ঘমেয়াদে বহন করা কঠিন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির প্রসঙ্গ তুলে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট বলেন, যুদ্ধের কারণে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঝুঁকি, জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি এবং নতুন করে সেনা সমাবেশের পরিকল্পনা নিয়ে সাধারণ রুশ নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে।
জেলেনস্কি চিঠিতে আরও বলেন, ইউক্রেন যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে চায় না। স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সংগ্রামে দেশটি টিকে আছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থনও অব্যাহত রয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হচ্ছে।
তিনি দাবি করেন, যেসব দেশ বা নেতা এই যুদ্ধে রাশিয়াকে সহায়তা করার চেষ্টা করেছেন, তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনার মুখে পড়েছেন। একই সঙ্গে তিনি কটাক্ষ করে বলেন, রাশিয়া বর্তমানে উত্তর কোরিয়া ও চীনের সহায়তার ওপর ক্রমেই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।
চিঠির গুরুত্বপূর্ণ অংশে জেলেনস্কি সরাসরি শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও ইরান সংকটে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। তাই বাইরের শক্তির অপেক্ষা না করে রাশিয়া ও ইউক্রেনের উচিত নিজেদের মধ্যে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা।
তিনি সুইজারল্যান্ড, তুরস্ক বা আরব বিশ্বের কোনও নিরপেক্ষ দেশে মুখোমুখি বৈঠকের প্রস্তাব দেন। সেই আলোচনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্রকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার কথাও উল্লেখ করেন।
শান্তি আলোচনাকে কার্যকর করতে জেলেনস্কি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন। তিনি জানান, আলোচনার পুরো সময়জুড়ে যুদ্ধবিরতি কার্যকর রাখতে ইউক্রেন প্রস্তুত রয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের উপগ্রহ প্রযুক্তির মাধ্যমে তা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে।
এছাড়া দুই দেশের মধ্যে ‘অল-ফর-অল’ ভিত্তিতে সব যুদ্ধবন্দি বিনিময় এবং যুদ্ধের সময় নিয়ে যাওয়া বেসামরিক নাগরিক ও শিশুদের দ্রুত ফেরত দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
চিঠির শেষাংশে জেলেনস্কি সতর্ক করে বলেন, যদি রাশিয়া নিজ উদ্যোগে যুদ্ধ বন্ধ না করে, তাহলে ইউক্রেন নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপ বাড়তে পারে।
সবশেষে যুদ্ধের সব নিহত মানুষের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ‘গ্লোরি টু ইউক্রেন’ স্লোগানের মাধ্যমে নিজের বক্তব্য শেষ করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।